ভাইফোঁটার মেলা/ বিরহী নদীয়া
চাকদার পরে মদনপুর স্টেশন। একদিন সেই স্টেশনে নামলাম। মদনপুর থেকে অটো করে ৬ কিলোমটার দূরত্বে বিরহী। ভাইফোঁটার দিন অনেক পুরোনো মেলা বসে এখানে। সেই মেলা দেখতে আসা। ভাইফোঁটাকে উপলক্ষ্য করে মেলা পশ্চিমবঙ্গে আর কোথাও হয়না, সেটা যেমন একটা বিশষত্ব তেমনই এই মেলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও স্থানের নামগুলোও আশ্চর্য ভাবে অলীক একটা কল্পকথার জগতে যেন আমাদের নিয়ে যেতে চায়।
যা হোক, ইতিহাসে বা গল্পে আসি। কেউ বলছেন এই মেলা চারশো বছরের কেউ বলছেন সাড়ে তিনশো। মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই মেলার শু্রু এরকম হিসাব করেই মেলার বয়স অনুমান করেছেন সবাই। মদনগোপালের যে মন্দিরটি কেন্দ্র করে এই মেলা-উৎসব সেটি তৈরী করেছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। মদনগোপালের বিগ্রহটি নিয়ে নানা গল্পকথা চালু আছে। কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষ রাঘব যখন রেউই গ্রামে রাজধানী তৈরী করেন তখন সেখানে গোপ বংশীয় লোকজনের বাস। এই গোপেরা খুব ধুমধামের সঙ্গে কৃষ্ণের পুজো করত। রাঘব তাই তাঁর নতুন তৈরী রাজধানীর নাম রাখলেন কৃষ্ণনগর। সেরকম ভাবেই কৃষ্ণনগর থেকে অল্প দূরত্বের এই বিরহীর পাশের গ্রাম হালদারপাড়ায়ও অনেক ঘোষের বাস ছিল। জাতিতে তারাও গোয়ালা। অবশ্যই কৃষ্ণভক্তও। সেই হালদার পাড়ার জনৈক ঘোষবাবুর অনেক সম্পদ। সাতটি মেয়ে তাঁর, কিন্তু ছেলে একটিও নেই। ঘোষবাবুর মনে তাই খুব দুঃখ। অনেক পুজোআচ্চা বহু চেষ্টায়ও পুত্রসন্তান না হওয়ায় তিনি ঠিক করলেন গ্রাম ছেড়ে চলে যাবেন। এক রাত্রে সেই উদ্দেশ্যে স্ত্রী কন্যা সহ হালদার পাড়া ছেড়ে কিছুদূর যাওয়ার পর জঙ্গলের মধ্যে শিশুর কান্না শুনতে পেলেন। কাছে গিয়ে দেখেন একটি পুত্র শুয়ে শুয়ে কাঁদছে। ঘোষবাবুর গ্রামত্যাগ আর হল না।
ছেলেটি ঘোষবাবুর নয়নের মণি। গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে যমুনা নদী। নদী পেরিয়ে ছেলেটি অন্য পাড়ের গ্রামে গিয়ে গরু চরায়। কিন্তু এ কাজে তার মন নেই। নদী পেরিয়ে অন্য গ্রামে গিয়েই গরুগুলি সে ছেড়ে দেয়। তারপর তারা নিজেদের ইচ্ছেমত চরে। ছেলেটি বড় গাছের ডালে কখনো বা গুঁড়িতে বসে থাকে উদাস হয়ে। এই অবসরে তার গরু অন্যের ক্ষেতের ফসল খেয়ে নেয়। কাঁহাতক এরকম চলতে পারে! চাষীরা অতিষ্ট হয়ে ঘোষবাবুকে অভিযোগ জানাল। তাতে অবশ্য ছেলেটির আচরনে কোনো পরিবর্তন হল না। একদিন পালক পিতার বকাবকি মাত্রা ছাড়ানোয় সে রাগে একটি নিম গাছের কান্ডের মধ্যে মিলিয়ে গেল। ঘোষবাবু বজ্রাহত। অবশেষে জানা গেল সে ছেলে সাধারণ কেউ নয়, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। তবে ফিরে আসবে সে আর আসবে মদনগোপাল বিগ্রহের রূপে। ঐ নিমকাঠ থেকেই তৈরী হবে তার মূর্তি। আর পূজিত হবে এখানেই। কিন্তু মূর্তি হবে কিভাবে? তার ব্যবস্থাও হল। মদনগোপাল নিজেই রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে স্বপ্নে মূর্তি তৈরীর আদেশ দিলেন। তৈরী হল বংশী হাতে মদনগোপাল মূর্তি। আর সেই মূর্তিকে ঘিরে এই মন্দির।
দিন যায়, মন্দিরের ভিতর মদনগোপালের একা লাগে। সঙ্গীনী নেই তার। মনে হয় ততদিনে সে কৈশোরোত্তীর্ণ। যৌবনের দরজায় পৌঁছে সামনে যমুনার জলের দিকে তাকিয়ে সে নিঃসঙ্গ বোধ করে। অতএব আবার স্বপ্ন। এইবার আদেশ হল যমুনার জলেই ভেসে আসবে আরেকটি নিম কাঠ আর তাতেই তৈরী করতে হবে রাধা মূর্তি। তৈরী হল তাও আর প্রতিষ্ঠিত হল মদনগোপালের পাশটিতেই। এইবার সব সম্পূর্ণ হল।
মদনগোপাল বিরহী হয়ে এখানে ছিলেন একদিন। সেই স্মৃতিতে জায়গার নাম হল বিরহী। আর ঘোষবাবুর সাত মেয়ের একটিই ভাই ওই মদনগোপাল। তাই ভাইফোঁটার উৎসব। ঘোষবাবু অনেক সাধ্যসাধনায় মদনগোপালকে পুত্র হিসেবে পেয়েছিলেন এখানে তাই পুত্রহীনা মায়েরাও আসেন পুত্রকামনায়, মেয়েরা আসে ভায়ের আশায়। আগে মন্দিরের দরজায় বা দেওয়ালের গায়ে ফোঁটা দেওয়ার চল ছিল। কেউ কেউ আজও বিশ্বাস করেন মন্দিরে প্রার্থনা জানানোর এক বছরের মধ্যেই পুত্রলাভ সম্ভব। আর যমুনার অপর পাড়ে যে গ্রাম, যেখানে বালকরূপী মদনগোপাল গরু চরাতে যেতেন তারাও ঠিক করলেন প্রতিদিনের দেবসেবার ভোগের চাল তাঁরাই পাঠাবেন মন্দিরে। ভোগের সামগ্রী আসে বলে গ্রামটির নাম হয়ে গেল ভোগের পাড়া। আজও বিরহীর আশেপাশের গ্রামের চাষীরা তাদের জমির প্রথম ফসলটি দিয়ে যান মদনগোপালকে।
কৃষ্ণনগরের বারোদোলের মেলার কথা জানেন অনেকেই। নদিয়ারাজের কুলবিগ্রহ বড়নারায়ণ বাদে নানা স্থানে নদিয়ার রাজার প্রতিষ্ঠিত যে বারোটি বিগ্রহকে কৃষ্ণনগরে নিয়ে আসা হয় তার একটি এই মদনগোপাল বিগ্রহ। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ১৫০ বিঘা জমি দান করেছিলেন মদনগোপালের সেবার উদ্দেশ্যে। তার মাত্র কিছুটাই আজ অবশিষ্ট আছে, সেখান থেকে আজও মন্দিরের দৈনন্দিন কাজ চালাবার খরচ ওঠে।
আর প্রতিবছর ভাইফোঁটার দিন বিশেষ পুজো হয়। মেলা বসে দিন সাতেকের জন্য। মন্দির কমিটির সম্পাদকের নাম শান্তিসেনা রায়। প্রতিবছর তাঁরা এই মন্দিরচত্বরে গণ ভাইফোঁটার আয়োজন করে থাকেন। যেসব মেয়েদের ভাই নেই তারা এখানে ভাই পায়। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে ফোঁটা দেওয়া হয়। হিন্দু বোনের মুসলমান ভাই জোটে আবার উল্টোটাও হয় হামেশাই। এমন কাজের উদ্যোক্তা্র নাম শান্তিসেনা না হয়ে যায়! আমার ভাগ্যেও ফোঁটা জুটেছিল। যদিও যখন পৌঁছেছিলাম তখন ফোঁটার অনুষ্ঠানটি শেষ হয়ে গেছে। তবু মন্দিরে সামনে বিগ্রহের সেবায় নিয়োজিত এক প্রৌঢ়া কপালে ফোঁটা দিয়ে বললেন বছর বছর যেন আমায় দেখতে পান এই দিনে এই দেবালয়ে। আমি তাঁকে নমষ্কার করলাম। ততক্ষণে মন্দির ফাঁকা হয়ে গিয়েছে সামনে দিয়ে সিঁড়ি নেমে গেছে কাছেই যমুনার জল পর্যন্ত। নামেই যমুনা, আসলে একটা নালাই এখন, তাও পানায় ভর্তি। একজন বিধবা মানুষ ঘাটের সিঁড়িতে বসে আছেন। তাঁর পরনের কাপড়টি চকচকে করে ধোয়া। সবাইকে ডেকে ডেকে ফোঁটা দিচ্ছেন তিনি। ফোঁটা এড়িয়েও যাচ্ছেন কেউ কেউ, পাছে পয়সা চান মহিলা। যারা যারা ফোঁটা নিচ্ছেন অচিরেই তাঁদের ভুল ভাঙছে। মহিলা পয়সার প্রত্যাশী নয়, সম্ভবতঃ সম্পর্কের প্রত্যাশী। পাশে বসলাম তাঁর, জিজ্ঞাসা করলাম কে আছে বাড়িতে? বললেন আছে কেউ কেউ। কিন্তু উনি একাই থাকেন। ওনার গোপাল আর উনি, বাকি জগতে কাজ কি?
আড়াই বিঘে জমিতে মেলা বসে। দোকানি দের কাছ থেকে খাজনা হিসেবে কিছু টাকা নেওয়া হয়। মেলার প্রথম দিনেই সে টাকা তাঁরা মিটিয়ে দেন মেলা কর্ত্বপক্ষকে। সাত দিনে পঞ্চাশ ষাট হাজার লোকের সমাগম হয়। তারা সব সোনাখালি, চন্ডীরামপুর, বসন্তপুর, রাজাপুর, হালদারপাড়া, ভোগের পাড়া, আয়েশপুর, খালধার এই সব গ্রাম থেকে আসে। কেউ অটো ট্রেকারে কেউ ট্রেনে। বেশিরভাগই মুসলমান। আর হিন্দুরা তো আছেনই। মেলায় গজা খুব বিক্রি হতে দেখলাম আর কাঠের টুল পিঁড়ি এইসব। যেহেতু দেবতা স্থানীয় নিমকাঠের তৈরী তাই মেলা থেকে কাঠের কিছু একটা কিনে নিয়ে যাওয়ার চল আছে। অন্যান্য মেলার মত রঙ্গীন পোস্টার দেবদেবীর ছবি মণিহারি জিনিস জিলিপি আর বাদামও আছে। তবে মেলার বেশিরভাগ দর্শক আর ক্রেতা মেয়েরাই। বিক্রেতারা আসেন হাবরা বারাসাত হরিণঘাটা চাকদা কল্যানী এইসব জায়গা থেকে।
যিনি আমায় ফোঁটা দিয়েছিলেন তিনি দুপুরের ভোগ খেয়ে যেতে বলেছিলেন। হাতে সময় ছিল। লোকজনও তেমন ছিল না। তাই দেবতাকে ভোগ দেওয়ার অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে দেখতে পেলাম। সবার অনুরোধে বিগ্রহের ছবিও তুললাম এক পংক্তিতে বসে চমৎকার প্রসাদ পেলাম। আর কি।
এ যাত্রায় নাটকীয় তেমন কিছু ঘটেনি আর। জীবনে কটাই বা নাটকীয় মুহুর্ত আসে আমাদের? শুধু কখনো কোনো কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দৈনন্দিনতার ছায়ায় ঢাকা কিছু অভ্যাসের মধ্যেই অসাধারণত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। ভাইফোঁটার মেলা হয়ে আসছে সে আজ প্রায় তিন চারশো বছর। এই দীর্ঘ সময়ে কত ছোট বড় হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা দেখেছে আমাদের দেশ। পাশাপাশি মেলাটাও বন্ধ হয়নি। বন্ধ হয়নি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে এই গণফোঁটার রেওয়াজ। দুপক্ষের ধর্মীয় কোনো ফতোয়া বাধা দিতে পারেন নি এই মেলার জনস্রোতকে। মেলায় এসেছেন বলে কোনো মুসলমান তাদের সমাজে বিধর্মী হয়ে গিয়েছেন বা কোনো হিন্দু মুসলমানকে ফোঁটা দিয়েছেন বলে তিনি জলঅচল হয়ে গিয়েছেন এমনটা শুনিনি। মানুষ চিরকালই রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় বেড়া অতিক্রম করে ঘনিষ্ট হওয়ার আয়োজন করে এসেছে। শান্ত সময়ে এই মেলাটাও আমাদের কাছে যেন একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছিল। কিন্তু এখনই আমদের রাজ্যেরই কোনো জেলায় সাম্পদায়িক অশান্তির সম্ভাবনায়, গুজবের আতঙ্কে যখন ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখতে হয় তখন ভাইফোঁটার মেলার মত স্বতস্ফূর্ত গ্রাম্য একটা অভ্যাস কত জরুরি সেটা বোঝা যায়। মন্দিরের বিগ্রহের সামনে দরিদ্র ওই পৌঢ়া কপালে ফোঁটা দিয়ে আমায় যখন বলেছিলেন প্রতিবছর এই মেলায় আমাকে যেন দেখতে পান তিনি, প্রতিবছর, সে মুহুর্তে ঘটনাটা অতিনাটকীয় ঠেকলেও আজ বিশেষ সঙ্কটে, এই গৃহবন্দী আর নিরুপায় অবরুদ্ধ থাকার দিনে যদি একবারও মনে পড়ে কি খাচ্ছেন পরছেন উনি তাহলেও যেন মেলাটার একটা সার্থক দিক খুঁজে পাওয়া যায়। অন্তত এটা মনে করতে শেখায় আমি বাদ দিয়েও এই জগতে ‘ওরা’ আছে। চিরকাল ওরা থাকবে। ওদের অতিনাটকীয় দারিদ্র, ওদের প্রিয়জনকে দেখার, অন্তত প্রিয় মানুষের চোখের সামনে মরতে পারার অবুঝ বোকা বোকা বাসনাকে চরিতার্থ করার জন্য হাঁটতে গিয়ে পথেই বেঘোরে মরার মধ্যে ওরা বারবার জানান দিয়ে যাবে ওরা ছিল। এই মেলায় সেই ওদের বিপুল উপস্থিতির মধ্যে ওদের বিপুল জীবনীশক্তির মধ্যে নিজেকে একবার প্রতিস্থাপিত করার একমাত্র উদ্দেশ্যই হল ওরা আছে এইটা অনুভব করা। অন্তত আমার ক্ষেত্রে।
মেলার ছবি


















কি অসাধারণ বর্ণনা ! অন্তর ছুঁয়ে গেল
উত্তরমুছুনঅসাধারন লেখা
উত্তরমুছুন