কল্পেশ্বর থেকে রুদ্রনাথ
পাহাড়ে সব ভালো। পাইন জঙ্গলের ঠান্ডা বাতাস সে ও ভালো। সেই বাতাস মেখে হোমস্টে-র বারান্দায় পৌঁছালে ভয়াল দর্শন যে কুকুর পরখ করতে আসে সেও কত ভালো। মনে হয় তার কাছে খুলে দিই বাকি রাস্তার জন্য সঞ্চিত খাবারের ঝাঁপি। পাহাড়ের দূরতম ঢেউ এর মাথায় যখন জমে ওঠে কালো মেঘ, জানি সেও ভালোমানুষের মত আজ রাতে জল দিয়ে আকাশের মুখ ধুয়ে দেবে। আর সকাল সকাল হেসে উঠবে পাহাড়। রাজনৈতিক পরিহাসের বাইরে এই নির্মল হাসি কতদিন হাসি নি। আমাদের আদিখ্যেতা দেখে আজ সেই হাসি হাসল আগামী দিনের সঙ্গী নরেন্দ্রজি।
আমরা যাবো কল্পেশ্বর থেকে রুদ্রনাথ। পাহাড়ে অনেকদিন ঘোরাঘুরির সুবাদে পঞ্চকেদারের মধ্যে তিনটি একাধিক বার দেখা হলেও বাকি থেকে গেছিল এই দুটি। এখন বয়সের আকাশে পশ্চিমের রক্তমেঘ, অতএব আর অপেক্ষা নয়।
কল্পেশ্বর থেকে রুদ্রনাথ নানাভাবে যাওয়া যায়। প্ৰথমত হরিদ্বার থেকে জোশিমঠ গামী বাসে বা গাড়িতে করে হেলাঙ নেমে সেখান থেকে ছোট গাড়িতে ঊর্গম। তারপরে সামান্য হাঁটাপথে দেবগ্রাম হয়ে দেখে নেওয়া যায় কল্পেশ্বর মন্দির। পঞ্চকেদারের মধ্যে একমাত্র এই মন্দিরই সারাবছর খোলা থাকে। কল্পেশ্বর দেখা সাঙ্গ করে গাড়িপথে আবার হেলাঙ হয়ে চলে আসা যায় গোপেশ্বর। সেখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে সাগর গ্রাম। সাগর থেকে দু দিনের হাঁটা পথে রুদ্রনাথ মন্দির।
কিন্তু এই পথে আমরা যাবো না। ঊর্গমে আমাদের গাড়ি চড়া শেষ। তারপরে কল্পেশ্বর মন্দির থেকে চড়াই পথে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে, ঘাসজমির চূড়ায় চূড়ায় হেঁটে দুমক, পানার হয়ে পৌঁছাবো রুদ্রনাথ। সেখান থেকে আবার উৎরাই পথে অনসূয়া মন্দির দেখে মন্ডল এসে তবে পায়ের নিস্তার।
বাসে আমার পাশের সীটের অশীতিপর গাড়োয়ালী বৃদ্ধ অবশ্য সহজে রেহাই দিলেন না। বাঙালি মুখ দেখেই জিজ্ঞাসা করলেন মুখোপাধ্যায়, চট্টোপাধ্যায় বা বন্দ্যোপাধ্যায় কি না। বুঝলাম উমপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এখনো হাঁটছেন কেদারের পথে পথে। যতই তাঁকে বলি পাহাড়ে নৈকষ্য কুলীনের দিন গিয়াছে, এখন সেখানে সাবঅল্টার্ন শ্রমিকের রমরমা। তিনি আমার পয়সার গরম অনুভবই করলেন না।
পঞ্চকেদার বইয়ের কল্পেশ্বর পর্বে উমপ্রসাদ লিখছেন তাঁর হাঁটা শুরু হয়েছিল জোশিমঠ থেকে। হেলাঙ পৌঁছে তিনি বেশ কিছুক্ষণ গল্প করেছিলেন। ফলে পথে তাঁর একটু দেরি হয়েছিল। আমরা অবশ্যি হেলাঙ এ বাস থেকে নামতেই একজন এগিয়ে এসে বললেন - চলুন। যেন তিনি আমাদের নিতেই এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরাও বিনা বাক্যব্যয়ে তাঁর গাড়িতে চেপে পড়লাম। ভাড়া বা গন্তব্য কোনোটাই জিজ্ঞাসা করা হল না।
সেসব কথা হয়েছিল গাড়িতে বসে, চল্লিশ মিনিটের যাত্রায়। লোকটির নাম সতীন্দ্র। নিজের বাড়িকে সে একটি আজকালকার উপযোগী হোম-স্টে হিসাবে গড়ে তুলতে চাইছে। তার আতিথ্য স্বীকার করলে এই মরশুমের প্রথম অতিথি হবো আমরাই। বাড়ির অবস্থান নিয়ে অবশ্য আলাদা একটা গর্ব তার আছে। একটু উঁচুতে হলেও বাড়িটি একেবারে ধ্যান বদ্রী মন্দিরের গায়ে।
সেই বাড়ি আমাদের পছন্দ হল। বিস্তীর্ণ আর লম্বা একটি উপত্যকার মধ্যে ঊর্গম গ্রাম। কাঁচা পাকা যব ও গমের সবুজ হলুদ ডোরাকাটা ফসলের ক্ষেত দুলে উঠছে মৃদু হাওয়ায়। তার মাঝে সিমেন্টে বাঁধানো রাস্তা চলে গেছে কল্পেশ্বর মন্দির পর্যন্ত। সেদিকে মুখ করে যেতে যেতে ডান দিকে দেখা যায় স্তরে স্তরে গাঢ় থেকে হালকা নীল পাহাড়ের সারি মিলিয়ে গিয়েছে দূরে। বাঁ দিকের পাহাড়ের গায়ে বাড়িঘর অনেকটাই কাছের। হলুদ ফসলের ক্ষেতে ঘেরা গর্বিত নিঃসঙ্গ একেকটি বাড়ি হাতের নাগাল ছাড়িয়ে উঠে গেছে পাহাড় বেয়ে উপরে। সামনের খাঁজের ভিতর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে বরফে ঢাকা পাহাড়চূড়া। ফসলের বোঝা নিয়ে চলে যাচ্ছেন এক বৃদ্ধা। তাঁর দীর্ঘ ছায়া ভারী হয়ে সেঁটে আছে সিমেন্টের রাস্তায়। পাকা ফসল ও নিজের ছায়া দুটিকেই একসাথে টেনে তুলতে তাঁর কষ্ট হচ্ছে। তবু সবাইকে দিনান্তে এই দুটি নিয়েই পাড়ি দিতে হয়।
ভোরবেলায় হলুদ যবের ক্ষেতের মধ্য দিয়ে চললাম কল্পেশ্বর দর্শনে। উমাপ্রসাদ প্রথম যেবার এখানে আসেন, শুনেছিলেন ঢাকের শব্দ। নতুন ফসল বোনা হচ্ছে জমিতে, সেই আনন্দে বাজছে ঢাক। তাঁর পোর্টারকে পয়সা দিয়ে পাঠিয়ে গ্রাম থেকে কিছু চাল ডাল সবজি কিনে আনতে বলেছিলেন। পোর্টার কোনো দোকান খুঁজে পায়নি। পয়সার বিনিময়ে এখানে কিছু বিক্রি হত না। গ্রামের সব লোক ছিল স্বয়ম্ভর। এমনকি প্রত্যেকের নিজস্ব জমি থাকলেও চাষের ব্যাপারে কোনো ভাগাভাগি ছিলনা। একজন স্বচ্ছন্দে অপরের জমিতে শ্রম দিতেন। নিত্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই গ্রামে উৎপাদিত হওয়ায় ও তার অবাধ আদানপ্রদানের রেওয়াজ থাকায় নগদ টাকার কোনো মূল্য ছিল না।
তিন বছর পরে আবার এখানে এসে তিনি এক সরকারি ঋণদাতাকে আবিষ্কার করলেন। সে অক্লান্ত ভাবে গ্রামবাসীদের নগদ অর্থের প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে চলেছে। কাউকে কাউকে ইতিমধ্যেই ঋণ করে ঘি খাওয়ার মন্ত্রে বশও করেছে। তার বিশ্বাস একদিন সে সফল হবেই। সেদিনও উমপ্রসাদ মনে মনে প্রথম বারের সেই ঢাকের বাদ্যি শুনতে পেয়েছিলেন। তবে এবার সে বাজনা শবানুগমনের।
এর পঁয়ষট্টি বছর পরে ঊর্গম ও দেবগ্রামে এসে আমরা মাত্র দুটি দোকান দেখেছি। একটি টেলারিং শপ। আরেকটিতে বিক্রি হচ্ছে চিপস ও চানাচুরের প্যাকেট। আর আবিষ্কার করেছি আমাদের গাইড পঞ্চান্ন বছরের নরেন্দ্রজী কে। যিনি আদতে একজন কাঠ মিস্ত্রি। নিজের দোতলা ঘর সম্পুর্ন নিজ হাতে বানিয়েছেন, শুধু তাই নয় প্রতিটি কাঠের বিম, দরজা, জানালা, কাঠের থাম সব তাঁর নিজের হাতে গড়া। নগদ অর্থে তাঁরও তেমন মতি নেই। অতএব শবানুগমনের বাজনা আমাদের কানে তেমন করে বাজেনি।
আরো পড়ছি কল্পেশ্বর মন্দিরের কাছে এলে একটা মাঝারি মাঠ দেখা যাবে। আজও সে মাঠ অটুট। মাঠের ধারে রাস্তা ঘেঁষে একটা পাথর বাঁধানো ফলক। তাতে মন্দিরের ড্রইং সম্বলিত বিবরণ। সামনে নদী। নাম কল্পগঙ্গা। নদীর উপর সবুজ ঝোলাপুল। তার পাশেই খুব উঁচু থেকে নেমে আসছে জলধারা। চমৎকার তন্বী একটি জলপ্রপাত। ভোরবেলা। তখনো সূর্য পাহাড়ের কোল ছাড়েনি। ফ্যাকাশে আলোর পথে পুল পেরিয়ে সামান্য উপরে পাথরের খাঁজে ছোট্ট মন্দির চত্বরে পৌঁছালাম।
দুর্বাশার শাপে ইন্দ্র শ্রীহীন হয়ে এইখানে শিব পার্বতীর আরাধনা করে কল্পবৃক্ষের খোঁজ পেয়েছিলেন। তাই এখানে শিব কল্পেশ্বর। মন্দির বলে তেমন কিছুই নেই। একটি বিরাট হেলানো পাথরের খাঁজে অর্ধ গোলাকার শিবলিঙ্গ। এত ভোরে পূজারিজী নেই। মন্ত্রহীন ক্রিয়াহীন আমরাই মন্দিররূপী পাথরের গুহার গায়ে আটকানো নকশা করা দরজা খুলে প্রাণভরে নিজস্ব বুলিতে দেবতাকে তুষ্ট করার চেষ্টা করলাম। তামার একটি ঘটি রাখা ছিল, তাতে জল নিয়ে ইচ্ছেমতো ঢাললাম। অবশেষে নিজেরাই মন্দির বন্ধ করে দিলাম। মন্দিরের দরজার খিলটি একটি ত্রিশূল। সেটি জায়গামত পরিয়ে দিলে দরজা আটকে যায়। আবার উমপ্রসাদ স্মরণ করলাম। তিনি এখানে এক বাবাজির অতিথ্যে বেশ কিছুদিন ছিলেন। সেই বাবাজি গোপনে তাঁর প্রিয় পিস্তলটি উমপ্রসাদকে দেখতে দিয়েছিলেন।
যেমন পঞ্চকেদার, তেমন সপ্ত বদ্রী। ঊর্গম গ্রামে সপ্তবদ্রীর মধ্যে ষষ্ঠ বদ্রী 'ধ্যান বদ্রী'র মন্দির আছে। আমাদের হোম-স্টে র দোতলা থেকে সুন্দর মন্দিরের চুড়ো দেখা যাচ্ছিল। পাশেই ইশকুল। এতক্ষণে সেখানে বাচ্চারা এসে গেছে। পাঠ আরম্ভের আগে প্রার্থনা সঙ্গীত শুরু হয়েছে। ছোট মন্দিরের চারিপাশ সবুজ ঘাসে ঢাকা। পূজারী আমাদের ভালোভাবে মন্দির ঘুরিয়ে দেখালেও তিরস্কৃত হলেন স্থানীয় এক বৃদ্ধার কাছে। গতকাল তিনি সময় মত না আসায় এক দর্শনার্থী ফিরে গেছেন। এর পুনরাবৃত্তি যেন না হয়। বৃদ্ধার কড়া হুঁশিয়ারিতে পুরোহিতও অধোবদন। অতি আশ্চর্য ব্যাপার।
ঊর্গম গ্রাম থেকে আমরা চড়াই পথে হাঁটা শুরু করলাম। ছোট ছোট পাকা ফসলের ক্ষেত। একটি দুটি মন্দির। একটি দুটি গাছের ছায়া। একজন দুজন চাষি মহিলা। রোদ উঠে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ ঝকঝকে আকাশ দেখা গেল। তারপর সেই একটি দুটি গাছ অনেকগুলো গাছ হয়ে গেল। তারপর গাছগুলো পরস্পরের খুব কাছাকাছি এসে অরণ্য হয়ে গেল। আকাশ আর দেখা যাচ্ছিল না।
সেই অরণ্যের মাঝে হঠাৎ করে ঘন সবুজ ঘাসে ছাওয়া একটি ছোট মাঠ। সেই মাঠের উপর শীর্ন একটি জলের রেখা। একটি হেলে পড়া আধমরা গাছ মাঠের উপর দন্ডী কাটার ভঙ্গিতে প্ৰণত হয়ে আছে। ঘাসের সবুজের থেকে ভিক্ষা নিয়ে তার মরা ডালেও দুয়েকটি পাতার ক্ষীণ আভাস। পৌঁছে গেলাম বাঁশা।
শীতের অবকাশ শেষে পঞ্চকেদারের মধ্যে সবচেয়ে শেষে খোলে রুদ্রনাথ মন্দির। পথের দুর্গমতা হয়ত এর কারণ। প্রতিবছর মোটামুটি এই দিনটি হয় ঊনিশে মে। এবার একটু ব্যতিক্রম হয়েছে। ঊনিশ তারিখ অমাবস্যা। তাই এবার মন্দির খুলবে বিশে মে। অজান্তেই আমরা এই দিনটিতেই মন্দিরে পৌঁছাবার পরিকল্পনা করেছিলাম। গোপেশ্বরের গোপীনাথ মন্দির থেকে রুদ্রনাথ মন্দির খোলার নির্ঘন্ট পাওয়ার পর দেখলাম এক আশ্চর্য সমাপতন হয়েছে।
শীতের দিনগুলিতে দেবতা রুদ্রনাথ গোপীনাথ মন্দিরে কাটান। তারপর দিনক্ষণ দেখে গোপেশ্বর থেকে ডোলি চেপে ফিরে আসেন নিজস্ব মন্দিরে। আমাদের ইচ্ছা ছিল সেই ডোলির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা পথ অন্তত হাঁটব। কিন্তু ডোলি বাহকেরা সবাই পাহাড়ি। তাদের চলার গতির সঙ্গে তাল মেলানো আমাদের পক্ষে অসম্ভব। উপরন্তু আমাদের নির্বাচিত পথ আর ডোলি যাত্রার পথ এক নয়। দুটি পথের মিলন হবে পানার বুগিয়ালে। সেখানে অবশ্য যাত্রার অনুগামী হওয়ার সুযোগ মিলতে পারে।
সেই আগ্রহে চড়াই ভাঙতে থাকি। কষ্ট হয়। থমকে দাঁড়াতে হয় বারবার। বিদেশি পত্রিকার তেলতেলে কাগজে ছাপা রঙিন ছবির মত কয়েকটি গাছ ঝলমল করছিল।তাদের হলুদ রঙের কাঁচা পাতার উপর দুপুরের রোদ্দুর। একসময় আমাদের অজান্তেই মেঘ করে এসেছিল। কাছের সবুজ বুগিয়াল সূর্যালোকে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল অথচ দূরের বরফের পাহাড় ছিল ঘোর কৃষ্ণবর্ণের মেঘে কালো।
কালগোট আসার আগেই মনে হয়েছিল জীবন হয়ত এইখানে নিঃশেষিত হবে। ততক্ষণে ঝুপঝুপ করে অবিশ্রাম বৃষ্টি পড়ছিল। সঙ্গে অন্তহীন চড়াই। সব ক্লান্তি দূর হল এক যুবতীর আন্তরিক চায়ের আতিথেয়তায়। তার ঘরটিও একটি হোম স্টে। বিশ্রামের আমন্ত্রণ মাখানো বালিশ আর রঙিন চাদর ঢাকা খাটের পাশে খোলা জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিল বড়সড় কালগোট গ্রাম, মেঘে ঢাকা আকাশ আর বৃষ্টি ধোয়া বাড়ির ছাদ।
সমস্ত আরাম আয়েশ নস্যাৎ করে এগিয়ে চলার স্বাভাবিক মনের জোর নরেন্দ্রর আছে। সে বলল সামনে চওড়া আর সমতল বড় রাস্তা আছে। অতএব কোনো মানেই হয়না এরকম একটা জায়গায় থেকে যাওয়ার। পথে অন্ধকার নেমে এলে আসুক। দুমক আমরা পৌঁছাবোই।
অচিরেই ঢালু পথে যেখানে পৌঁছালাম সেখানে বাস স্ট্যান্ডের মত একটা আশ্রয়। কয়েকজন রুকস্যাক নিয়ে অপেক্ষমান। ঊর্গম থেকে কালগোট পর্যন্ত গাড়ি চলে। সে অবশ্য আলাদা পথ। কিন্তু অনেকেই কষ্ট এড়াবার জন্য এই পর্যন্ত গাড়িতে এসে তারপর হেঁটে দুমক যান। অপেক্ষমান দলটি তেমনই করেছেন। এবার তাঁরা হাঁটবেন। আমাদের পেয়ে তাঁরা পথহীন পথে গাড়ি চড়ার রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বর্ননা দিলেন।
বহুদূরে দুমক গ্রাম দেখা যাচ্ছিল। এসব ক্ষেত্রে মনে মিথ্যা আশ্বাসের সঞ্চার হয়। যেন ওই তো। কিন্তু একঘন্টা পরেও যতদূরের গ্রাম ততদূরেই রয়ে গেল। সোজা রাস্তা পাহাড়ের পেট চিরে চলে যাচ্ছিল। আমরাও সেদিকেই যাচ্ছিলাম নির্ভাবনায়।
নরেন্দ্রকে বললাম এগিয়ে গিয়ে ভালো দেখে একটা আস্তানা খুঁজে রাখতে। সে কিন্তু গেল না। একটু পরেই কারণটা বুঝলাম। ওই সমান একঢালা পথ কখনো কখনো পাহাড়ের ভাঁজে ঢুকেছে। সেই ভাঁজে রাস্তা তার অস্তিন থেকে মেলে ধরেছে অস্ত্রশস্ত্র। পাথরের ধস নেমে পথ অতি দুর্গম। হাত না ধরে পার হওয়া যায় না। তদুপরি এই বৃষ্টিতে ইতস্তত জলধারা নেমে এসেছে। অতিদ্রুত শরীরের দুর্দান্ত ভারসাম্য বজায় রেখে পেরিয়ে না গেলে ভিজে একশা হতে হয়।
সার্কাসের পোষ না মানা অবাধ্য পশুদের উপর যেমন সাঁইসাঁই শব্দে রিং মাস্টারের চাবুক নেমে আসে ভেবেছিলাম পাথরের স্রোতে আমাদের আনাড়িপনার উপরে সেরকমই আছড়ে পড়বে নরেন্দ্রর বাক্যবাণ। কিন্তু সে অবলীলায় বাড়িয়ে দিল তার নিজের পায়ের পাতা। যেন সিঁড়ির এক ধাপ। সেই পায়ে পা রেখে পেরিয়ে এলাম বিপদজনক একটা খাড়া উৎরাই। নিচে নদীতে নেমে জলের উপর সে বিছিয়ে দিল পাথর।
সকল অবস্থাতেই নরেন্দ্র নির্বিকার। পৌঁছানো নিয়ে তার মনে কোনো সংশয় নেই। যেন সেটা শুধু সময়ের অপেক্ষা। কোনো তাড়া নেই তার। একটি বিড়ি ধরিয়ে সে দূরের দিকে তাকিয়ে থাকে। সবাই একত্রিত হলে ধীরে সুস্থে চলা শুরু করে।
দুমকে পৌঁছাতেই বাচ্চারা খেলা থামিয়ে দৌড়ে এসে আমাদের পা ছুঁয়ে প্রণাম করে আবার দৌড়ে খেলতে চলে গেল। কোন পুণ্যের আভা আমাদের মাথায় জ্যোতির্বলয় এঁকে দিয়েছিল তা বুঝতে না পেরে হাতের ক্ষীণ লাঠিটি নিয়ে হাত জোড় করে আমরা তাদের উদ্দেশ্যেই প্রতিনমস্কারের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলাম। ততক্ষনে মেঘের আড়ালে পশ্চিম আকাশে সূর্য অস্তে গেছিলেন।
দুমকেও হোম স্টে আছে। তদুপরি বাথরুমে পশ্চিমি শৈলীর প্যান। সব অতি পরিছন্ন। তবু খুব সকালেই সেখান থেকে বেরিয়ে পড়তে হল। আজও সাত আট ঘন্টার হাঁটা। প্রথমে উৎরাই পথে নেমে যেতে হল এক নদীর ধারে। উপর থেকে জঙ্গলের মধ্যে ঘোড়ার খুরের মত নদীর বাঁক দেখা যাচ্ছিল। একটি গাছ ঝুঁকে পড়েছিল সেদিকে। দেখা যাচ্ছিল আমাদের ফেলে আসা দুমক গ্রাম, আরো দূরে গতকাল ফেলে আসা কালগোট।
এই রাস্তায় এই এক মজা, কয়েক দিন আগের ছেড়ে আসা গ্রামকেও দেখা যায়। এত স্পষ্ট অতীত দেখে মাঝেমাঝেই স্মৃতিকাতরতায় আচ্ছন্ন হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। সে আশায় আবার জল ঢেলে দেয় সামনের প্রখর চড়াই। আজ আকাশ মেঘলা। কষ্ট এতে কম হলেও বৃষ্টির ভয় তাড়া করে ফেরে। এতদিনে নরেন্দ্রর নির্লিপ্তি কিছুটা আয়ত্ত করেছি। অবশ্য নরেন্দ্র সক্ষম। হাওয়ার বেগে সে চলে যেতে পারে যেখানে খুশি। তবু সব বুঝেশুনেই সে নির্লিপ্তি অর্জন করেছে, আর আমরা নিরুপায় হয়ে নির্লিপ্ত। এই যা তফাৎ।
তোলি বুগিয়ালে পৌঁছে আমাদের অনুশীলিত সব নির্লিপ্তির অবসান ঘটল।নিস্তব্ধ গাঢ় বনভূমি ঘেরা সবুজ ঢালু প্রকাণ্ড এক ময়দানের কিনারায় হঠাৎ দাঁড়িয়ে মন থেকে তুমুল খুশির বুদবুদ উড়ে বাতাসে মিশে যেতে চাইছিল। বুগিয়ালের মাঝখানে মাঝারি এক জলাশয়, শেষ প্রান্তে একটি লম্বা কুটির। বাঁ দিকে কিনারায় একটা ঝোপড়ি আরো বাঁ দিকে বনবিভাগের ছোট্ট পাকা বাড়ি। ওই গাঢ় স্বচ্ছ সবুজ বিরাট প্রান্তর জনশূন্য। শুধু কয়েকটি অশ্বেতর জীব জলের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করছে। খানিকটা উপর থেকে অতিজাগতিক এইসব দৃশ্য দেখে মনে হল পুরাণে দেবতাদের নানা ছলে মর্ত্যে আগমনের পিছনে আসল কারণ হল পৃথিবীর এই অপার সৌন্দর্য।
মাঠের বাঁ দিকের কিনারা বরাবর হেঁটে আমরা ওই একটিমাত্র কুটিরে পৌঁছালাম। সেখানে পনিটেল বাঁধা একাকী এক যুবক পথিকের জন্য সামান্য আহার্যের ব্যবস্থা রেখেছেন। রুদ্রনাথ মন্দির এখনো খোলেনি তাই পথিকশূন্য তার আশ্রয়। সে নিজেও এসেছে মাত্র দুদিন আগে। আমাদের বসতে বলে সে ভাত রাঁধতে আরম্ভ করল। তার পাথর বাঁধানো কুটিরের বাইরের উঠোনে বসে পাশের বনভূমির ছায়া পড়া কালো গভীর জলাশয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তিন দিক ঘেরা সবুজ প্রান্তরের শেষে যেদিকে আকাশ দেখা যাচ্ছিল সেদিক মেঘে কালো। তবু কয়েকটি বরফাবৃত পাহাড় সেই মেঘ ফুঁড়ে জ্বলজ্বল করছিল। কুটিরের বাইরে বেশ কিছু ধবধবে সাদা পাথর ছড়িয়ে ছিল। ঘাসের উপর তাদের বিন্যাসে বোঝা যায় এটা পরিত্যক্ত মনুষ্যবাসের ধ্বংসাবশেষ। এই পরাবাস্তব দৃশ্যের মধ্যে বসে চেতনা লুপ্ত হচ্ছিল।
গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত আমাদের সম্বিৎ ফেরালো। একঘন্টা পর তোলি তাল কে ডানদিকে রেখে আমরা আবার বনভূমিতে মিশে গেলাম। বনের গহন অন্ধকারে এবার একটি দুটি করে রডোডেনড্রন ফুলের দেখা মিলল। রক্তলাল চোখে কখনো অনেক উঁচু থেকে তারা পথচারীর দিকে তাকিয়ে থাকে, কখনো মাটিতে পড়ে ট্রেকারের ভাইব্রাম সোলের সঙ্গে কিছুদূর গিয়ে লুটিয়ে পড়ে চিরতরে। তেমনই সাদা বেগুনি আর হালকা গোলাপি ফুল। পথের পাশে যেখানে অন্ধকার সেখানে এবার একটু বরফ। সেই বরফের উপরে শেষতম গাছটিতে ঝেঁপে এসেছে সাদা রডোডেনড্রন। তারপর হঠাৎ খাড়া একটা ঘাসে ঢাকা গিরিশিরা। ছুরির ফলার মত সেই শিরার একদিকে পায়ে চলা রাস্তা ঢেউ খেলে চলে যাচ্ছে আরও দূরে। তারই এক প্রান্তে পানার।
রাত গভীর। আরো জনা তিন চার যাত্রীর সঙ্গে আমরা পানারে একটা তাঁবুতে আশ্রয় পেয়েছি। তাঁবুটা গিরিশিরার একেবারে ধার ঘেঁষে। তাঁবুর বাইরে নিরাপদে দুটি পা মাত্র সামনের দিকে ফেলা যায়। তৃতীয় পদক্ষেপে গভীর ঢাল বেয়ে যেখান থেকে আর ফেরা যায় না তেমনই কোনো দূরত্বে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা। রাত্রির নিকষ কালো অন্ধকারে সেদিকে উজ্জ্বল হয়ে ফুটে ছিল অবিকল একটি হীরের নেকলেস।
থোকা থোকা ঘাসের গোড়ায় জমে থাকা আদিম অন্ধকারে দাঁড়িয়ে অবাক বিস্ময়ে সভ্যতার সেই আলোকদ্যুতির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আয়ু ফুরালে এই জীবনের অভিজ্ঞতার স্মৃতি নিয়ে যদি অন্য কোনো লোকে পৌঁছান সম্ভব হয় সেই লোক হয়ত আজকের এই রাত্রির মত হবে। নিকটে থাকবে নিরুপায় জমাট অন্ধকার আর দূরে থাকবে ফেলে আসা পৃথিবীর বুকে মায়ালগ্ন হয়ে থাকা আলোর গয়না। তবে সেই নিশিডাকের মায়ায় ফেরা হবেনা আর কোনোদিনই।
রুদ্রনাথ মন্দিরে পৌঁছানোর যাবতীয় রাস্তা মিলে যায় পানারে এসে। কিন্তু এখানে থাকার ব্যবস্থা কম। হয়ত যাত্রার শুরুটাই হয়নি এখনো তাই। আজ অল্প দূরত্বের পথ। দেরি করে বেরোলেও ক্ষতি নেই। তাঁবুর আশ্রয় থেকে কিছুদূর গেলেই চমক লাগে। অর্ধ বৃত্তাকারে তুষারে ঢাকা পাহাড়চূড়ো। একেবারে ডানদিকের নন্দাদেবী থেকে শুরু করে হাতি ঘোড়ি হয়ে চৌখাম্বা পর্যন্ত সবাই সূর্যালোকে ঝলমল করছে। কাছেই শুকিয়ে যাওয়া ছোট্ট একটা জলাশয়।
ঘাসের মধ্যে ফুটে আছে অতি সংক্ষিপ্ত অতি উজ্জ্বল বেগুনি আর হলুদ ফুল। চড়াই পথে মাটির দিকে তাকিয়ে চললে পথশ্রমের সঙ্গে মাড়িয়ে যাওয়া মৃত ফুল দেখে কষ্ট দ্বিগুন হয়। চড়াই শেষ হয় একটা গিরিশিরার মাথায় এসে। সেখানে দুটি স্তম্ভের মত করে পাথর সাজানো তার উপরে গৈরিক আর হলুদ পতাকা লাগিয়ে একটা তোরণের মত করা হয়েছে। এর নাম পিত্রাধার।
এই জায়গাটি নিয়ে উমপ্রসাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। এখানে পৌঁছে তিনি কয়েকটি উলম্বভাবে প্রোথিত চ্যাপ্টা বড় বড় প্রস্তরখন্ড দেখতে পেয়েছিলেন। এগুলো তাঁর কাছে ব্রিটেনের স্টোনহেঞ্জ এর মত মনে হয়েছিল। আমরা আরেকটু কাছেই ঝাড়খণ্ডের হাজারীবাগের মেগালিথ এর তুলনা আনতে পারি। ইতিহাসপূর্ব যুগে, পৃথিবীর সর্বত্র এবং ভারতেও আদিবাসীরা কখনো সমাধি মন্দির হিসেবে কখনো সৌর ক্যালেন্ডার বা মানমন্দির হিসেবে নিখুঁত জ্যামিতিক হিসেব কষে এইসব মেগালিথ স্থাপন করেছিলেন। মৃতের সমাধিস্থল হিসেবে তার দেহাবশেষের উপর আজও ঝাড়খন্ডের আদিবাসীদের মধ্যে মেগালিথ স্থাপনার নজির আছে। উপরন্তু পিত্রাধার এই নামের মধ্যে পিতার সমাধির ইঙ্গিতও স্পষ্ট।
সুতরাং একদা এইখানে ভারতের মূলনিবাসীদের উপস্থিতির সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া চলে না। এই সন্দেহ আমাদের মনে দৃঢ় হয়েছে রুদ্রনাথ মন্দির খোলার অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করে।
পিত্রাধার পেরোবার পরে পথ কিছুটা নীচে নেমে গেলেও শুরু হল পাহাড়ের ঢালে জমে থাকা গোড়ালি ডোবানো বরফের উপদ্রব। সফেদ পিচ্ছিল সেই পথ বারবার আমাদের নিম্নাভিমুখী করছিল। একটি করে বরফের ঢাল আসে, খানিক বিরতির পরে আরেকটি, মাঝে বোতলে জল ভরে নেওয়ার জন্য ঝোরা।
এরকমই ঢালে, একটি গিরিশিরার প্রান্তে রুদ্রনাথ মন্দির। গোপেশ্বরের মন্দির থেকে দেবতাকে নিয়ে যে ডোলি 17 ই মে রওনা দিয়েছিল তা 19 শে ই রুদ্রনাথ পৌঁছে যায়। ফলে ডোলির সঙ্গে যাত্রা করা আমাদের ভাগ্যে ঘটেনি। তবু 19 শের সন্ধ্যায় আমরা প্রধান পুরোহিতের ঘরে পুষ্পশোভিত দেবতার সামান্য আভাসটুকু পেয়েছিলাম। রাত্রে বৃষ্টি হচ্ছিল তবু অনেকেই লঙ্গরখানায় রাতের খাওয়া খেতে গেছিলেন।
রুদ্রনাথ মন্দির যেহেতু পাহাড়ের খাড়া ঢালে তাই মন্দিরে পৌঁছানোর পথ এবং মন্দির পরিসর বেশ সংকীর্ণ। তবুও গাঁদার মালায় ও ফুলে যথাসাধ্য সাজানো হয়েছে। খুব ভোরে শিঙ্গা বেজে উঠল। কয়েকজন স্থানীয় ভক্ত ও পুরোহিতদের ছোট্ট দলের সঙ্গে মিশে আমরা মন্দিরে ঢুকলাম। ভিতরে শ্বেত পাথরের একটি নন্দীমূর্তি।পাশের একটি জানালা দিয়ে ভোরের প্রথম আলো তীরের মত সেই বৃষের কুঁজের উপরে এসে পড়ছে। সেখানে গোঁজা আছে একটি বেগুনি রডোডেন্ড্রন ফুল। আলোর তীর সেই ফুলকে ভেদ করে তার যাবতীয় শিরা উপশিরা গর্ভকেশর আমাদের চোখের সামনে উন্মুক্ত উজ্জ্বল করে তুলছে। যেন ফুলটির দেহবীনার তারে তারে বেজে উঠছে আলোর ঝঙ্কার।
একই বই থেকে মন্ত্রোচ্চারণ করছে অনেকে । গর্ভগৃহে একটি খাড়া শিলাকে নানা ভাবে ধুইয়ে দিচ্ছেন প্রধান পুরোহিত। কখনো দুধে কখনো জলে। এর পরে কাপড় দিয়ে মার্জনা। বারবার এই ক্রিয়া পুনরাবৃত্ত হওয়ার পর ওই শিলায় লাগল চোখ, তৃতীয় নয়ন, মোটা গোঁফ, সর্বোপরি শিরে রাজছত্র গলায় উত্তরীয়। ব্যাস। শিলাই হয়ে উঠল শিবের মুখ। এ এক আশ্চর্য রূপান্তর।
এরপর ভোগ। সে দৃশ্য দেখার অধিকার কেবল পুরোহিতের। তারপর ভর। মন্দিরের ভিতর থেকে কান্নার আওয়াজ। সেখান থেকে ছুটে বের হল একটি যুবক। তার হাতের থালায় চাল। শরীর প্রবলভাবে কম্পমান। সেই ত্রস্ত হাত পায়ের অস্থির নিয়ন্ত্রণহীন কম্পন সত্বেও হাতের থালা থেকে সে তুলে নিল একমুষ্টি চাল তারপর তা মুখে ঘষে, যেন বা খানিকটা উচ্ছিষ্ট করেই ছুঁড়ে দিল রুদ্রনাথ মন্দিরের পাশে বনদেবীর মন্দিরে মূর্তির দিকে। এভাবে ক্রমান্বয়ে কয়েকবার। তারপর দর্শকের দিকে তাকিয়ে উঁচু মন্দির চত্বর থেকে হরির লুঠের মত ছড়িয়ে দিতে লাগল চাল। সেইসঙ্গে মুখে দর্পিত বাণী। যেন আজ ঈশ্বর তাকে সমস্ত লোকের মঙ্গল ঘোষণার্থে পাঠিয়েছেন ।
মন্দির থেকে এবার বেরোলেন আরেকজন। তাঁরও শরীর কম্পিত হচ্ছে। কোমরে গোঁজা একখানি ছুরি। সুচালো দিকটা তাঁর পেটের ভিতরের দিকে । এক হাতে ছুরির বাঁট শক্ত করে ধরে সে পেটের উপর ছুরিটির অভিমুখ স্থির করে রেখেছে। অন্য হাতে ভারী মোটা একটি চৌকো কাঠের খন্ড দিয়ে এইবার সে ছুরির বাঁটের উপর খুব জোরে আঘাত করতে লাগল। যেন পেরেক ঠোকার মত করে ছুরিটা প্রোথিত করে দিতে লাগল নিজের শরীরের অভ্যন্তরে।এই ক্রিয়াও পুনরাবৃত্ত হতে লাগল। যদিও রক্তপাত ঘটল না।
এই সব দেখে আমাদের বাংলার গাজনের কথা মনে পড়ছিল। আরামবাগের বাতানল গ্রামে দেখছিলাম হাতে পায়ে পেরেক ঠোকা ক্রুশবিদ্ধ মানুষ বীরের মর্যাদায় গ্রাম প্রদক্ষিণ করছে। এখানেও ভরে পড়া মানুষদের মর্যাদা অসীম। প্রধান পুরোহিত পর্যন্ত চালের থালা হাতে এঁদের পশ্চাৎ অনুগমন করছেন। প্রাক বৈদিক যুগ থেকেই শিবের উপাসনা প্রচলিত ছিল। কখনো কখনো শিবকে যজ্ঞ বিরোধী ভূমিকায় দেখা গেছে। দক্ষযজ্ঞ বিনাশকারী হিসেবে তাঁর ভূমিকা স্মর্তব্য। বৈদিক শাস্ত্র-বিচার এবং বেদ বিরোধী এবং ঈশ্বর-উদাসীন সমস্ত চিন্তাকেই আত্মীকরন করে এগিয়েছে হিন্দুধর্ম। এখানে শিবের পাশেই দেখছি বনদেবীর অধিষ্ঠান। লৌকিক আচার সব পালিত হচ্ছে তাঁকে ঘিরেই আর মূল মন্দিরে পড়া হচ্ছে বৈদিক মন্ত্র।
মন্দিরের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়ালে পঞ্চপান্ডবের গুহা। পাহাড়ের খাড়া ঢালে পাথরের ছোট ছোট খোপ। সেগুলিকে মূল মন্দিরের অনুকৃতিই বলা যেতে পারে। ভরে পড়া মানুষরা সেখানে গিয়েও ছড়িয়ে দিচ্ছেন চাল। সুনীল আকাশ। অর্ধবৃত্তাকারে মহীয়ান সব পাহাড়চূড়া। সেদিকে চাল ছুঁড়ে দিয়ে আপাত অপ্রকৃতিস্থ বা অধিক প্রকৃতি-স্থ সেসব মানুষ কিছু বলছেন। তরজমা করলে হয়ত তার মানে হত- চিরকাল এরকমই থেকো তুমি, আর এই সময় পেরিয়ে আমাদের না দেখা কোনো সময়ে আমাদের অনুপস্থিতিতে উত্তরসূরিদের মুখে অন্ন যুগিও।
ফিরে আসার আগে আনুষ্ঠানিক ভাবে শেষবারের মত দেবদর্শন করতে গেলাম। প্রসাদ ছিল গুড় দিয়ে মাখা শুকনো ঝুরঝুরে আটা আর শুকিয়ে যাওয়া জুনিপারের গোছা। তারপর লঙরখানায় অপূর্ব স্বাদের ডাল ভাতের প্রসাদ।
আমাদের ফেরার পথটি আলাদা। প্রচলিত পথে কিছুদূর গিয়ে তারপর ডান দিকে বাঁক নিয়ে পাহাড় বেয়ে খাড়া উঠে যেতে হচ্ছিল। এটা কোনো রাস্তা নয়। বরফের কারনে এইভাবে খাড়া উঠে আমরা পৌঁছাবো নাওলা পাস। সেখান থেকে উৎরাই পথে অনসূয়া মন্দির।
নাওলা পাসে উঠে আমাদের চক্ষুস্থির। সামনে বিরাট বরফের ঢাল। এখনো কোনো যাত্রীই এ পথে উঠে আসেন নি বা নেমে যাননি। তাই রাস্তা করতে হবে নিজেদের। ইতিমধ্যে আমাদের সঙ্গী হয়েছেন আরেকটি যাত্রী। তাঁর দুই পাহাড়ি সঙ্গীও থমকে দাঁড়ালো। এবার বরফ ঢালের অপর প্রান্তে এক বিদেশি আর বিদেশিনীর উদয় হল। তারাও থমকে দাঁড়ালো। কেটে গেল বেশ কিছুক্ষণ। অবশেষে একটা নীরব বোঝাপড়ায় দুটি দলই দুই প্রান্ত থেকে ওই বরফে নেমে পড়লাম। পাহাড়ি মানুষ যে ক'জন ছিলেন তাঁরা আপ্রাণ সাহায্য করে সবাইকে পার করলেন।
তারপর শুধু নামা আর নামা। গহন জঙ্গল। রাস্তায় গদির মত বিছিয়ে আছে শুকনো পাতা। যদি তাতে আমাদের পা পিছলে যায় তাই নরেন্দ্র হাতের লাঠি দিয়ে পাতার স্তুপ সরাতে সরাতে চলছিল। নিস্তব্ধ গভীর বনভূমি। ভালুকের ভয়। পাতায় পাতায় গভীর বুনন ভেদ করে সূর্যের আলো ঢোকে না। হাঁটু ক্লান্ত হয়ে পড়ে। বৃষ্টি এসে যায়। দূরে দেখা যায় কাণ্ডাই বুগিয়াল। গহন জঙ্গলের ফাঁকে একটুকরো বৃক্ষহীন ঘাসের সবুজ। মাত্র একটা ছোট্ট কুটির। অনায়াসে রাত্তিরটা থেকে যাওয়া যায় এখানে। কম্বল আছে। আর আছে আহারের ভরসা। সেই মাঠের কচি ঘাস যতই বলে ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর, ততই আমাদের ফেরার টিকিটের কথা মনে পড়ে।
কান্ডাই এর পর আবার সেই ঘন বন। তারপর আরেকটি বুগিয়াল। গৃহ আছে কর্তা নেই। বন্ধ গৃহের স্তব্ধতায় কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে আবার উৎরাই পথে বালখিল্য গঙ্গার পাড়ে। এর মানে অনসূয়া মন্দির প্রায় এসে গেল। নদীর অন্য পারে অত্রিমুনির গুহা। অত্রিমুনির স্ত্রী অনসূয়া। তাঁর সতীত্বের গুনগান শুনে ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরের স্ত্রীদের ঈর্ষা হল। নানা ভাবে অনসূয়ার সতীত্বের পরীক্ষা নিয়েও প্রতিবারই তাঁকে বিচ্যুত করতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে তিন দেবতা অতিথি হয়ে এসে অনসূয়ার স্তন্য পানের আবদার জানালেন। অনসূয়া অত্রিমুনিকে স্মরণ করলে মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে তিনি তিনজনকেই শিশু করে দিলেন। সেই কাহিনীর স্মরণে নদীর নাম বালখিল্য।
অনসূয়া মন্দির প্রাচীন নয়। কিন্তু তার অবস্থান চমৎকার। চারিদিকে জঙ্গল। মন্দির সুন্দর করে বাঁধানো। জলের কল অতিথিনিবাস, গরম জলের জন্য প্ল্যান্ট, সব আছে। রাত্রে পৌঁছে সন্ধ্যা আরতির শেষে মাথায় পেলাম দেবীর পাদপদ্মের গোলাপ পাপড়ির আশীর্বাদ।
অনসূয়ায় রাত বাড়ছিল। অন্ধকার আকাশ থেকে আলো না থাকার একটা চাপা আলো ছড়িয়ে পড়েছিল ঘুমন্ত বনের উপর, মন্দিরের গায়ে। সামনের দিকটা হাট খোলা বড় রান্নাঘরে কাঠের আগুনে রুটি হচ্ছিল। রুদ্রনাথের দিক থেকে মন্ডল যাওয়ার মোটা রাস্তাটা এই রান্নাঘরের ওপর দিয়েই চলে গেছে। আগলহীন, সব দেখতে পাওয়া উন্মুক্ত হেঁশেলটিই এই দোকানের আর যাত্রীনিবাসের প্রকান্ড বিজ্ঞাপন। দোতলা সেই বাড়ির উপর থেকে আমরা শুনলাম বাঁশির সুর। আকাশের নেই আলোর সেই চাপা আলোর সঙ্গে তখন মিশছে উনুনের আগুনের লাল আভা। 'পর দুঃখে উপকার করে তোয়ে মন অভিমান না আয়ে রে।' রান্নাঘরে বাঁশি বাজাচ্ছে মন্ডল গ্রামের একটি ছেলে। আমাদের দেখে সে বাউল গানের প্রসঙ্গ তুলল। তাদের সাধন পদ্ধতির স্বতন্ত্রতায় সে মুগ্ধবিশ্বাসী। বাঁশির সুরের সঙ্গে আমরা মনে মনে গাইলাম 'ভজ ভজ মানুষ ভগবান, মানুষ ভজলে পাবি পরিত্রাণ। সেই মানুষের অতুল শক্তি দিতে পারে গতি মুক্তি। সাধিলে বিশ্বপ্রকৃতি অষ্টসিদ্ধি হাতে পায়।'
উমপ্রসাদ তাঁর ভ্রমণ বর্ণনায় ধ্যান বদ্রী মন্দিরে এরকমই একটি রাতের অভিজ্ঞতার উল্লেখ করেছিলেন। মন্দির তখন ছিল জঙ্গলাকীর্ন। সেই জঙ্গল পরিষ্কার করে রাতে তাঁরা শুয়েছেন, এক বৈরাগী এসে উপস্থিত হল। হাতে একতারা। তিনি লিখেছেন সেদিনও তারার আলো জ্যোৎস্নার ভ্রম জাগাচ্ছিল। তারপর নক্ষত্র খচিত আকাশের নিচে ফিকে হয়ে আসা ঘুমের ভিতরেও সারারাত ধরে চলল গান আর গান।
উমপ্রসাদের কল্পেশ্বর ভ্রমনের শুরুর দিন আর আমাদের শেষের দিন এইভাবে মিলে গেল। নরেন্দ্র টাকা পয়সা বুঝে নিল না। আমরাই অতি ব্যাকুলতায় তাকে বোঝালাম যে আমরা তাকে ঠকাই নি। সে বলল যদি আমাদের টাকার অসুবিধে হয় তবে থাক না হয় আজ। বাড়ি ফিরে সময় সুযোগ মত পাঠালেই চলবে খন। হরিদ্বারে পৌঁছানোর পথে তার কথা খুব মনে পড়ছিল। ফোন করে শুনতে পেলাম বাড়ির উঠানে বসে সে কাঠের কাজ করছে। তার নিজ হাতে বানানো বাড়ি সম্পূর্ণ হতে আর সামান্য বাকি। রাঁদার খসখস শব্দ, বাটালির ঠুক ঠাকের মধ্যে শুনতে পাচ্ছিলাম গান- 'সেই মানুষের কি আশ্চর্য, দিতে পারে ষড়ঐশ্বর্য। ওই যে মধুর মাধুর্য পরমাত্মা তারই নাম।'
'ভজ ভজ মানুষ ভগবান।'


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন