বরোদার কীর্তি মন্দির ও নন্দলাল বসু


বাংলার 1333 সালের 25 শে বৈশাখ। "নটীর পূজা' কবির জন্মদিনে সন্ধ্যাবেলায় শান্তিনিকেতনে উত্তরায়নে কোণার্কে প্রথম অভিনীত হলো। 'নটী'র ভূমিকায় নামলেন আচার্য নন্দলালের জ্যেষ্ঠা কন্যা (জন্ম 1907) শ্রীমতী গৌরী। তাঁর নৃত্যভঙ্গিমায় একটি অপরূপ অপার্থিব সৌন্দর্য ফুটে উঠলো। শান্তিনিকেতনের নৃত্যকলার ইতিহাসে এ হলো একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা।" লিখছেন পঞ্চানন মন্ডল তাঁর 'ভারতশিল্পী নন্দলাল' বইতে।

সে 1926 সাল। আর আজ 2024 এ কলকাতা থেকে প্রায় দুহাজার কিলোমিটার দূরে নন্দলাল বসুর আঁকা দেওয়াল চিত্রের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল সেদিনের অবিস্মরণীয় নৃত্য আমরা যারা দেখিনি তাদের জন্যই যেন এই ছবিতে সেই নৃত্যের ছন্দ গতি আর সমস্ত অভিনয় সুষমা ধরে রাখা হয়েছে। মনে হল এমন কথাই তো লিখেছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর 'পঞ্চতন্ত্র' বইতে। এই দেওয়ালচিত্রেরই বিষয়ে লিখতে গিয়ে তিনি বলছেন "সে চিত্র তো স্টাটিক নয়, স্তম্ভিত’ নয়–বস্তুত তার দিকে অনেকক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, এই বুঝি নটী আরেকখানি অলঙ্কার গাত্র থেকে উন্মোচন করে দর্শকের দিকে, আপনারই দিকে অবহেলে উৎক্ষেপ করবে, এই বুঝি মৃদঙ্গে ভিন্ন তাল ভিন্ন লয়ের ইঙ্গিত ভেসে উঠবে আর সঙ্গে সঙ্গে নটী তার নৃত্য দ্রুততর করে দেবে, লাস্য-নৃত্য তাণ্ডবে পরিণত হবে, মন্দমন্থর ‘নমো হে নমো’ অকস্মাৎ অতিশয় দ্রুত ‘পদযুগ ঘিরে’ চন্দ্রভানুর মদমত্ত নৃত্যে নবীন বেশ গ্রহণ করবে।" 

এরই সূত্র ধরে মনে পড়ছিল রবীন্দ্রনাথের 'নটীর পূজা' নাটকের অবিস্মরণীয় গানগুলো। 'নিশীথে কি কয়ে গেল মনে', তারপরে 'আর রেখো না আঁধারে আমায় দেখতে দাও' আহা এই সব গান নির্জনে শুনে কতদিন বুকের ভিতর হাহাকার করে ফিরেছে বসন্তবাতাস। কত রক্তের রঙের অশ্রুমোচন, কতবার ঘর ছেড়ে  যাওয়ার, সর্বত্যাগের আহবান ...।

গুজরাটের বরোদা শহর এখন ভাদোদরা। সেখানে থাকব মাত্রই কয়েক ঘন্টা। সৌধে ইমারতে আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। কিন্তু এই একটি শিল্পকর্ম না দেখে শহর ত্যাগ করা নিজের কাছে অন্যায় বলে মনে হয়েছিল। শুধু তার টানেই কীর্তি মন্দিরে আসা।

কীর্তি মন্দির পর্যটকদের কাছে একটি অবহেলিত সৌধ। এ দেখলেও হয়, না দেখলেও হয়। আবার যাঁরা তালিকা মিলিয়ে দ্রষ্টব্য স্থান দেখে নিতে চান তাঁদের কারো মনে হতে পারে ব্যস্ত রাস্তায় চলতে চলতে অটোর খাঁচা থেকে একপলক দেখাই হয়ত যথেষ্ট। হয়ত বলছি এ কারণে, যদি আপনি এই সৌধের ভিতরে নন্দলাল বসু কৃত দেওয়াল চিত্রের খোঁজ না রাখেন।

আর যদি চিত্রকলার অনুরাগী হন, যদি বাল্যবয়সে একবারও অন্তত হলুদ মলাটের 'রূপাবলী' সিরিজের কোনো একটি বই থেকে লাইন ড্রইং অভ্যাস করে থাকেন তবে কীর্তি মন্দির আপনার কাছে তীর্থস্থান হতে পারে।

বিভিন্ন সময়ে মাটির তলায় প্রাগৈতিহাসিক সময়কালে মনুষ্যবাসের যেসব চিন্হ পাওয়া গেছে তা বরোদায় অতি প্রাচীন জনপদের অস্তিত্বের সম্ভাবনাকে মজবুত করে। তবে অতদূর থেকে শুরু না করে এই লেখার প্রয়োজনে যেটুকু দরকার বরোদার সেই মারাঠা রাজত্বের সামান্য অংশ বলা যাক।

1870 সালে মহারাজ খন্দেরাও গায়কোয়াড় হঠাৎ মারা গেলে সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে সমস্যা গুরুতর আকার নিল ও ক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হল। এই সময়ে তাঁর পত্নী মহারানী জামনাবাই সাহেব এক পুত্র দত্তক নিলেন। তাঁর নাম শ্রীমন্ত গোপালরাও গায়কোয়াড়। সিংহাসনে বসার পর তাঁর নাম হল সায়াজী রাও গায়কোয়াড় তৃতীয়। আজকের বরোদা শহরের যা উন্নতি তা মূলত তাঁরই চেষ্টায় আর কর্মতৎপরতায়। এর একটা উদাহরণ 'ব্যাংক অফ বরোদা' আজও টিঁকে আছে। এমন একজন উদ্যমী রাজা তাঁর পূর্বপুরুষদের দেহাবশেষ ও মর্মর মূর্তি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে 1936 সালে তৈরি করলেন কীর্তি মন্দির।

শুরুতে স্থপতি হিসাবে ডাকা হল  ভি আর তলোয়ারকরকে। সেটা 1921 সাল। তিনি তখন স্টেট আর্কিটেক্ট। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হল লুটিয়েন সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে রোমের প্যান্থিয়ম এর আদর্শে একটি সৌধের নকশা তৈরি করতে। কিছু সংযোজন বিয়োজনের পরে নকশা গৃহীত হল 1925 সালে।

স্মৃতিমন্দিরের জায়গা নির্বাচন করতে গিয়ে  কেদারেশ্বর মন্দির সংলগ্ন ময়দানকে বেছে নেওয়া হয়েছিল কারন সেখানেই রাজ পরিবারের সদস্যদের দাহ করা হতো।

মহারাজ সায়াজী রাও গায়কোয়াড় তাঁর রাজ্যাভিষেকের সুবর্ন জয়ন্তী বর্ষ উদযাপনের দিন 15 ই জানুয়ারি 1926 সালে স্বহস্তে সৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন। মাটি খুঁড়তে গিয়ে পাওয়া গেল গুপ্ত যুগের ইঁট।

ভিত মজবুত করার জন্য কারিগরি পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল মেসার্স চার্লস এফ স্টিভেনশন কোম্পানির সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মিস্টার লি' র কাছ থেকে। অবশেষে ওয়াঘজীভাই বল্লভভাই এর হাতে সৌধ তৈরি শেষ হল 1936 সালে। খরচ হল 5,60392/- টাকা। যদিও অনেক পরে শিল্পী কে জি সুব্রহ্মন্যন তাঁর প্রবন্ধ 'নন্দলাল বসুর ভিত্তিচিত্র' তে এই সৌধের খানিকটা নিন্দাই করেছেন। তাঁর কাছে গোটাটাই "সস্তা রুচির" আর "বিশেষত্বহীন" লেগেছিল।

1930 সালের 10ই জানুয়ারি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বরোদায় গেছিলেন। 27  শে জানুয়ারি সেখানে তাঁর বক্তৃতা ছিল। বিষয় 'Man the Artist' উপস্থিত ছিলেন রাজা সায়াজিরাও গায়কোয়াড়। সম্ভবত সেই বক্তৃতা শুনেই রাজা কীর্তি মন্দিরের দেওয়ালে ফ্রেসকো আঁকানোর চিন্তাভাবনা করেছিলেন। 1938 এ হরিপুরা কংগ্রেসের পোস্টার আঁকার পরে দেশজুড়ে নন্দলাল বসুর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখান থেকে ফেরার পথে রাজার আমন্ত্রণে দেওয়ালচিত্র আঁকার জায়গা স্বচক্ষে দেখতে তিনি কীর্তি মন্দিরে এলেন। কিন্তু তখনই আঁকা শুরু হল না। হল পরের বছর। 1939 এর শেষ দিক থেকে 1946 সাল পর্যন্ত সাত বছরের মধ্যে চার দফায় তিনি বরোদা গেলেন। এই সময়পর্বেই চারটি দেওয়ালে চারটি বিষয় নিয়ে ছবি আঁকা হল। এখানে একটু সমস্যা আছে। কে জি সুব্রহ্মন্যন তাঁর দুটি লেখায় সর্বশেষ ভিত্তিচিত্রটি অঙ্কনের সন দুরকম লিখেছেন। তাঁর উপরোল্লিখিত বাংলা রচনায় লিখছেন 1945 সাল ও ইংরেজি 'NANDALAL BOSE: A BIOGRAPHICAL SKETCH' লেখাটিতে,  যেটি বিশ্বভারতীর পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল (মে 1983- এপ্রিল 1984 সংখ্যা) লিখেছেন 1946 সাল। তবে পঞ্চানন মন্ডলের বইটিতে নন্দলাল বসুর জবানীতে লেখা হয়েছে "1946 সালে শেষ প্যানেল করলুম উত্তরা অভিমন্যু।"

ট্রেন থেকে নেমে ব্যাগপত্তর স্টেশনে রেখেই অটো ধরলাম। বেলা সাড়ে তিনটে - চারটে হবে। মার্চ মাসের প্রখর রোদ। শুকনো আবহাওয়া। স্টেশন থেকে সামান্য দূরত্বে বিশাল জায়গা নিয়ে ইংরেজির 'ই' আকৃতির সৌধ। সামনে সবুজ লন। সূর্য একটু ঢলে পড়েছে। সৌধের কাছাকাছি বড় বড় গাছ। মাত্র একজন প্রহরী গেটের কাছে বসে আছেন। দূরে গাছতলায় কয়েকটি ছোট বাচ্চা খেলছে। টুরিস্ট তো দূরের কথা আমি ছাড়া কোনো মানুষের উপস্থিতিই নেই।

প্রকান্ড এই সৌধের সামনের মূল দরজা বন্ধ। বাকি দরজাও আটকানো।ফলে কোথায় কোন দেওয়ালে সেই ছবি, কে বলে দেবে? ভাষার ব্যবধান পেরিয়ে বেশ কিছুক্ষণ পরে আমার উদ্দেশ্য  প্রহরী বুঝলেন। আর আমি বুঝলাম 'বালু কাকা' নামের এক ব্যক্তিই এ ব্যাপারে একমাত্র সহায়।

সত্তর ঊর্ধ বালু কাকা সদাশয় মানুষ। সৌধের পাশে খুব ছোট একটা মোটা পাথরের তৈরি আউট হাউসে থাকেন। সারা জীবন কাটিয়েছেন এই সৌধের গায়ে গা লাগিয়ে। অতিদ্রুত আমার অভিপ্রায় ধরে নিয়েই একটি সঙ্কীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে নিয়ে গেলেন কীর্তি মন্দিরের দোতলায়। এটা প্রকান্ড একটা ব্যালকনি। রেলিং দিয়ে নীচে তাকালে দেখা যাচ্ছে একতলায় বড় হলঘর।

সিঁড়ি দিয়ে উঠে আমার বিপরীতে দক্ষিণ দিকের দেওয়ালে একটা অর্ধ গোলাকার জানালা। তার উপরে সেই বিখ্যাত দেওয়ালচিত্র গঙ্গাবতরণ। প্যানেল নম্বর 1। আঁকা শুরু হয়েছিল 1939 সালের অক্টোবর মাসে। নন্দলাল বসুকে সাহায্য করার জন্য সঙ্গে এসেছিলেন কলাভবনের উঁচু ক্লাশের ছাত্ররা আর অধ্যাপক বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়।

1920 সালে পাকাপাকি ভাবে শান্তিনিকেতনে চলে আসার একটু আগে থেকেই নন্দলাল বসুর ছবিতে কিছু পরিবর্তন হয়। এর আগে তাঁর গুরু অবনীন্দ্রনাথের মতই তিনি কাব্য পুরাণ অনুসারী ছবি আঁকায় মনোনিবেশ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে তিনি তাকালেন শান্তিনিকেতনের প্রকৃতি ও মানুষজনের দিকে। তাঁর ছবিতে বিষয় হিসেবে এসে পড়ল সাঁওতাল মানুষজন, আশ্রমিকেরা আর  প্রকান্ড আকাশের নিচে ছড়িয়ে থাকা উন্মুক্ত পৃথিবী। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধোয়াট পদ্ধতি থেকে সরে এসে নিলেন অনচ্ছ জলরং এর পদ্ধতি। রঙ হল সমতলীয়। স্তিমিত রেখা হল স্পষ্ট, ছবিতে এল ভাস্কর্য গুণ। অজন্তার ছবি দেখার পর তিনি ভিত্তিচিত্র আঁকার তাগিদ অনুভব করলেন। শুরুটা হয়েছিল 1918 তে বসু বিজ্ঞান মন্দিরের দেওয়াল ছবি এঁকে। এমনকি নিজের হাতিবাগানের বাড়ির দেওয়ালেও  এঁকেছেন। ছবিতে লোকায়ত বিষয় আশ্রয় করলেও কীর্তি মন্দিরের দেওয়ালচিত্র আঁকার সময় তিনি আবার ফিরে এলেন পৌরাণিক ধর্মীয় আখ্যান আর মন্ডনধর্মী অবয়বে।

গঙ্গাবতরণ ছবিতে পদ্মফুলের উপরে দন্ডায়মান বড় আকারের কেন্দ্রীয় যে অবয়ব প্রথমেই চোখ টানে তা শিবের। সেই ফুলের উপরেই তাঁর বাঁ পায়ের কাছে জলপাত্র নিয়ে প্রণত হয়ে আছেন এক নারী। তাঁদের শরীরের চারপাশে গৈরিক অগ্নিশিখার বলয়। মহাদেবের ছ টি হাত। আংশিক প্রকাশিত তিনটি হাতে রয়েছে ত্রিশূল, শিঙ্গা, ডমরু। অন্য হাতটি বরাভয় মুদ্রায়। শরীরের অগ্রভাগে সম্পুর্ন প্রকাশিত বাকি দুটি হাতে দুটি পাত্রে ধরা আছে অমৃত আর অগ্নিক্ষরা বিষ। মহাদেবের করুনাঘন তিনটি মুখ, অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ ত্রিকাল নির্দেশক। কিন্তু প্রতিটি মুখেই ঠোঁটের পাশ থেকে বেরিয়ে রয়েছে শ্বদন্ত। এই রূপ বেদের রুদ্রের বর্ননা অনুসারী। সেখানে তিনি হিংস্র পশুর মত, তিনি 'আকাশের লোহিত বরাহ'। আবার তিনিই বদান্য সহজে তুষ্ট আর কল্যাণপ্রদ। শিল্পী এই মুখে মহাদেবের স্বভাবের বৈপরীত্য অসাধারন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর গলায় মুন্ডমালা। কিন্তু এমন ভাবে আঁকা হয়েছে যা দূর থেকে নৃমুন্ডের মত দেখালেও খুঁটিয়ে দেখলে মনে হয় যেন সাদা ধুতরা ফুল। আর গলায় উত্তরীয়ের মত করে প্যাঁচানো রয়েছে সাপ।

মহাদেবের শরীর ঘিরে অগ্নিবলয়ের বাইরে নীল ও সাদার অলঙ্কৃত নকশায় জলের ফেনিল উচ্ছাস দেখানো হয়েছে। তাঁর ডান দিকে সেই আলপনায় জলকল্লোলের উপরে একটি পাত্র। দেবস্থান ট্রাস্ট থেকে ছবিগুলোর পরিচয়জ্ঞাপক যে বোর্ড লাগানো ছিল, সম্প্রতি রঙের কাজ হওয়ার জন্য খুলে রাখা আছে, তাতে লেখা আছে ওই পাত্র ব্রহ্মার কমন্ডলু। এমন একটা বিশ্বাস আছে যে জ্যৈষ্ঠ শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে, ভগবান ব্রহ্মার কমন্ডলু থেকে গঙ্গা মহাদেবের জটা হয়ে হরিদ্বারে ব্রহ্মকুন্ডে নেমে আসেন।

কমন্ডলুর নীচে একটি নারীমূর্তি। সমান  আকারের আরেক নারীমূর্তি অঙ্কিত হয়েছে মহাদেবের বামপাশেও। ভগবতী ও মন্দাকিনী। গঙ্গার দুটি রূপ তারা। ভগবতী স্বর্গ মর্ত্য অতিক্রম করে ভগীরথের অনুগমন করে ভূগর্ভে প্রবাহিত আর মন্দাকিনী স্বর্গের নদী। গঙ্গার আরেক নাম ত্রিপথগা। কারন তিনি স্বর্গ মর্ত্য পাতাল তিন পথ অতিক্রম করেছেন। এই ছবিতেও তিনটি স্তরে গোটা নদীর যাত্রাপথ এঁকে রাখা আছে।

কিন্তু সবচেয়ে আকর্ষণীয় মহাদেবের ছবিটি। শিয়রে চাঁদ ও গঙ্গার উপস্থিতি থেকে নখাগ্র পর্যন্ত সমস্ত বিশদে আঁকা। মুখমন্ডলে কোমলতা ও পাশবিকতা আবার চোখের দৃষ্টিতে যোগীর ঔদাসীন্য সব একসঙ্গে ফুটে উঠেছে কুশলী ড্রইং এ। যদিও কে জি সুব্রহ্মন্যন লিখেছেন তিব্বতি তনখার মত এ ছবিতে মহাদেব যেন নিচের তলায় রাজপুরুষের মূর্তির দিকে তাকিয়ে রাজাকে সাবধান করে দিচ্ছেন, খ্যাতিলাভের ইচ্ছেকে সংযত করতে বলছেন। কিন্তু শিবনেত্র বললে আমাদের মনে যেরকম চোখের ছবি ভেসে ওঠে এ চোখ যেন সেরকমই আঁকা হয়েছে। এতই মহত্বপূর্ন এই ছবিটি যে সব কিছুকে ছাপিয়ে এর বিশিষ্টতা চোখ টানে।
নন্দলাল বসুর 75 বছরের জন্মদিনে কলকাতা থেকে পদ্মফুল আনানো হয়েছিল। ছাত্রছাত্রীরা সে সব একে একে তাঁর পায়ে দেবে। সকলে বসে অপেক্ষা করছে। হঠাৎ রামকিঙ্কর উল্টোদিকে চলে গেলেন। সেদিকে একটা কল্কে গাছ। ফিরে এলেন হাতে করে কিছু কল্কে ফুল নিয়ে। জিজ্ঞাসা করায় বললেন- "আরে ওরকম শিব কে আঁকতে পেরেছে? পদ্ম দেব না কল্কে দেব,  তোমরা বলো!"
রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় মাস্টারমশাই নন্দলাল বসুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এই ঘটনাটির উল্লেখ করেছেন। গঙ্গাবতরণ ছবি থেকে চোখ সরাবার আগে মনে হল যেন এর থেকে সত্য অনুভব আর কিছু হয় না।

1940 এ দ্বিতীয়বারের যাত্রায় আঁকলেন মীরাবাঈ। মীরার জীবনকাহিনী তিনটি ভাগে বর্ননা করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগের সীমানা নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে তাঁর গানের পংক্তির ক্যালিগ্রাফি, করে দিয়েছিলেন সৈয়দ নামে একজন লিখন শিল্পী। শুরুতেই রয়েছে "মে রে তো গিরিধর গোপাল/ দুসরো না কোঈ" এই  ভজনের পংক্তিমালা। গৈরিক প্রেক্ষাপটে লম্বালম্বি ভাবে সাজিয়ে রাখা কবিতার পরেই আঁকা হয়েছে একটি গাছ। ডালে দুটি পাখি। সামান্য দূরত্বে রাজপ্রাসাদের ঘরের আদল। ভিতরে বসে আছেন রানী মীরাবাঈ। পরনে বুটিদার শাড়ি। মাথায় ঘোমটা। উদাসীন, খানিকটা দুঃখী মুখ সামান্য অবনত। ছবিটি প্রথম জীবনে রাজপুতবধূ মীরাবাঈ এর সাংসারিক জীবনের বেদনা ও ঈর্ষাকাতর চক্রান্তকারী পরিজনদের দেওয়া দুঃখের কথা মনে পড়িয়ে দেয়।
মাঝের অংশের শুরুতেই নীল জলাশয়। তাতে দুয়েকটি পদ্ম ফুটে রয়েছে সেই দিকে তাকিয়ে বসে আছেন উদাসীন এক রমণী। পুকুর পাড়ের প্রকান্ড এক গাছের নিচ দিয়ে দুই সখী কলসি কাঁখে জল ভরে নিয়ে যাচ্ছেন। গৃহস্থালির এই পুনরাবৃত্তিমূলক প্রত্যহিকতার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে সামান্য দূরত্বে সাদা পোশাক পরিহিতা হাতে চিমটা নিয়ে বসে থাকা উজ্জ্বল আর বিশিষ্ট ভাবে আঁকা আরও এক নারীমূর্তি, মীরাবাঈ। যে সংসার তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়েছিল বিষের পাত্র তাকে পিছনে ফেলে রেখে তিনি ধ্যানমগ্ন। তার পরেই একতারা হাতে নৃত্যরত এক সাধিকার রূপে তাঁকে দেখছি সঙ্গীতের তুরীয়ানন্দে বিভোর। বিভিন্ন সম্প্রদায় ও মতের সাধকরা উৎসুক হয়ে ঘিরে বসে নৃত্য দেখছেন আর ভজন শুনছেন। এঁদের কাউকে কাউকে গানের সঙ্গে সঙ্গত করতেও দেখা যাচ্ছে। কেউ বাজাচ্ছেন ডাফলি, কারো হাতে চিমটা। কে জি সুব্রহ্মন্যন ছবির এই অংশের সঙ্গে কেন্দুলির মেলায় বাউলদের আখড়ায় গানের আসরের মিল খুঁজে পেয়েছেন। মীরাবাঈ এর জীবন সম্পর্কে তথ্যের খুবই অভাব। যতটুকু পাওয়া যায় তাও অলৌকিকতা মন্ডিত। শোনা যায় তিনি গুরু নানকের সঙ্গে দেখা করতে চেষ্টা করেছিলেন, শ্রীজীব গোস্বামীর সঙ্গেও। কিন্তু দুজনে দুটি ভিন্ন কারনে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন নি। গোস্বামী তুলসীদাসজীকে তিনি চিঠি লিখেছিলেন। তার উত্তর এসেছিল কবিতায়। আর সন্ত কবীরের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল বলেও শোনা যায়।সমকালীন ভক্তি মার্গের সাধকদের সঙ্গে তাঁর যে নিরন্তর যোগাযোগের চেষ্টা ছিল ছবির এই অংশ সেই ঘটনাগুলিকে স্মরণ করায়। সমস্ত সম্প্রদায়ের সাধকদের মধ্যে তাঁর প্রভাবের প্রতি ইঙ্গিত করে।

প্যানেলের অন্তিম অংশে শেষ জীবনে দ্বারকায় মন্দিরে কৃষ্ণের বিগ্রহে তাঁর বিলীন হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটি আঁকা হয়েছে। প্রেক্ষাপটে শান্ত মহাসমুদ্রের বিস্তার। ফুল ফোটানো লতাপায় ঘেরা মন্দিরের ভিতরে গৈরিক বস্ত্র পরে মীরাবাঈ আর কিছুক্ষণ পরেই মিলিয়ে যাবেন তাঁর প্রিয়তম পুরুষ ও দেবতার শরীরে। তাঁর হাতদুটি শেষ নমস্কারের ভঙ্গিতে জড়ো করা। হিন্দু ধর্ম যে জগৎসভার শ্রেষ্ঠ ধর্ম আর তার উচ্চকিত প্রকাশ যে খুবই জরুরি আজকাল ক্ষণে ক্ষণেই সেটা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। ঠিক কোন খাদ্যাভ্যাসে, কি আচরণে, কি পোশাকে একজন হিন্দু ঠিকঠাক হিন্দু হয়ে ওঠে এই নিয়ে যতবার বিতর্ক হয় ততবারই মীরাবাঈ এর একটি ভজনের কথা মনে পড়ে- “নিত নহানে সে হরি মিলে তো জলজন্তু হোই।/ ফলমূল খাকে হরি মিলে তো বন্দর হোই।।/ তীরণ ভখন-সে হরি মিলে তো বহুত মৃগী অজা।/ স্ত্রী ছোড়কে হরি মিলে তো বহুত হৈ খোজা।।/ দুধ পিকে হরি মিলে তো বহুত বৎসবালা।/ মীরা কহে বিনা প্রেমসে ন মিলে নন্দলালা।।”

1943 সালে এসে আঁকলেন নটীর পূজা। এই বিষয়ে অনেকবার তিনি ছবি এঁকেছেন। তার দুটির কথা বইতে পেয়েছি। 1927 এ প্রথমবার খদ্দরের উপর টেম্পারাতে আর দেয়ালচিত্র হিসেবে প্রথমবার শান্তিনিকেতনের চীনা ভবনের দেওয়ালে । এটি শান্তিনিকেতনের সেই দেওয়াল চিত্রেরই আরেকটি রূপ। অজাতশত্রু রাজসিংহাসনে লোভাতুর দৃষ্টি দিয়েছেন শুনে পিতা বিম্বিসার নিজেই সিংহাসন ত্যাগ করলেন। এই ঘটনায় তাঁর স্ত্রী লোকেশ্বরী স্বামীকে বীর্যহীন দুর্বলচিত্ত সাব্যস্ত করেছেন। তবুও রাজমহিষীর মনে 'মহাকারুণিকো নাথ' বনাম 'বজ্রক্রোধডাকিনৈ' এর দ্বন্দ্ব। একদা ভগবান বুদ্ধ রাজ উদ্যানে একটি অশোকতরুতলে বসে উপদেশ দিয়েছিলেন। বিম্বিসার সেই স্থানটিতে স্তুপ তৈরি করে দিয়েছিলেন। রাজ অন্তঃপুরের নারীদের প্রতি নির্দেশ ছিল সেখানে প্রাত্যহিক অর্চনার।অজাতশত্রু হিন্দু ধর্ম আশ্রয় করে বুদ্ধের অর্চনায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর একদিন নটী শ্রীমতির প্রতি আদেশ হয়েছিল অশোকতরু তলে সেই স্তুপে নৃত্যের অর্ঘ্য দেওয়ার। জীবন সংশয় জেনেও নটী সেদিন স্তুপপাদমুলে বুদ্ধের অর্চনা করলেন। সেদিন নৃত্যের তালে তালে তাঁর শরীর থেকে একটি একটি করে খুলে যেতে লাগল  নটীর বেশ আর ধীরে ধীরে উন্মোচিত হল এক গৈরিক বস্ত্রের ভিক্ষুনী। রাজ প্রাসাদ ও নগরের বাড়িঘর, ইঁট রঙা স্তুপের পরিমন্ডলে কাহিনীর এই পর্যন্ত আঁকার পর শিল্পী আঁকলেন একটি নিখাদ প্রাকৃতিক দৃশ্য। বৈভবের ঝকমকির পর সহসাই দেখলাম প্রকান্ড একখানি থালার মত হলুদ চাঁদ উঠেছে শাল জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে। বিস্তীর্ণ প্রকৃতি চন্দ্রালোকে ধুয়ে পড়ে আছে, আর প্রণামের ভঙ্গিতে পড়ে আছেন নটী শ্রীমতী। তাঁর পরনে ভিক্ষুণীর বেশ।
মহারানী লোকেশ্বরীর সংলাপে আছে - 'অহিংসা ইতরের ধর্ম! হিংসা ক্ষত্রিয়ের বিশাল বাহুতে মানিক্যের অঙ্গদ, নিষ্ঠুর তেজে দীপ্যমান'। আজও তো দেশনেতার বিশাল বক্ষদেশের জয়গান শুনি, তবু চিরকাল শিল্পী কবি সেই ধর্মের কথা বলছেন যা 'যত উঁচু মাথাকে সব হেঁট করে দেবে। ব্রাহ্মণকে বলবে সেবা করো, ক্ষত্রিয়কে বলবে ভিক্ষা করো।'

1946 শে র কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের খন্ডচিত্রের মধ্যেও তারই ছায়া। শুরুটা হচ্ছে যুদ্ধের প্রস্তুতি দিয়ে তারপরে ধারাবাহিক কাহিনী বর্ননা না করে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি বিশিষ্ট চরিত্রের অঙ্কনের মধ্য দিয়ে চিত্রী অভিব্যক্তির চরমে পৌঁছেছেন। অভিমন্যু দ্রোনাচার্য পার্থসারথী সকলেই ভীষন যুদ্ধরত। ভয়ার্ত পাখিরা ওড়াউড়ি করছে। ভেঙে যাওয়া রথের চাকাও হয়ে উঠছে অস্ত্র। ছিন্ন প্রত্যঙ্গ, ভগ্ন তীর, উদ্যত বর্শার ফলা পটের এক খোপ ফুঁড়ে চলে যাচ্ছে অন্য পটে। অতি উজ্জ্বল মেটে লাল আর নীল রঙে মন্ডনধর্মী অসাধারন কয়েকটি শ্বাসরুদ্ধকারী পটের পরেই আসে গান্ধারীর পট। গান্ধারীর চোখ বন্ধ তবু তিনি যেন দেখছেন সামনে তাঁর পুত্র পরিজনের দেহ দগ্ধ হচ্ছে। অগ্নিশিখার সামনে শুনতে পাচ্ছি তাঁর ও ধৃতরাষ্ট্রের বিলাপ।
একমাত্র এই দেওয়ালের ছবি আর গঙ্গাবতরণ  বেশ খানিকটা ভালো অবস্থায় আছে বাকি গুলো ছাদ থেকে জল চুঁইয়ে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত। একজনও পর্যটক নেই। আসেও না কেউ তেমন আজকাল। শেষ বসন্তের উত্তপ্ত হাওয়ায় একাকী আমার পিছনে স্তব্ধ হয়ে পাথরের মেঝেতে বসে আছেন প্রহরী বালুকাকা। সামনে একটি লোহার সিঁড়ি, যাতে উঠে নন্দলাল বসু একদিন এই ছবি এঁকেছিলেন। শ্রীমতী গাইছেন 'তুমি কি এসেছ মোর দ্বারে/ খুঁজিতে আমার আপনারে?/ তোমারি যে ডাকে/ কুসুম গোপন হতে বাহিরায় নগ্ন শাখে শাখে'। পিছনে চমকে তাকাই প্রকান্ড দরজা দিয়ে রোদ এসে পড়ছে কোথায় সেই শিল্পী জাগানিয়া দর্শক!

মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন ছবি এঁকে কি হবে? জানালা খুললেই তো সব দেখা যায়। গাছপালা, প্রকৃতি, মানুষজন। আবার সেগুলোই এঁকে লাভ কি? তার চেয়ে স্বদেশী করা ভালো। শুনে রবীন্দ্রনাথ হেসে বলেছিলেন শিল্পকলা হল ঋণ শোধ। প্রকৃতি আমাদের যে আনন্দ দেয় তা প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা মানুষের চিরকালীন। তিনি আরো বলেছিলেন খবরের কাগজে রাষ্ট্রপতির ধ্বজা আস্ফালনের চেয়ে একখন্ড কাগজে ছবি আঁকা অনেক ভালো। ভারতীয়ত্ত্ব ও হিন্দুত্বকে সমার্থক করে স্বদেশচেতনার যে হাওয়া ইদানিং উঠেছে তাতে সম্পূৰ্ভাবে আত্মনিবেদনের আগে ভাবা দরকার আমাদের দেশের মানুষের আনন্দ বিনোদন একদা ছিল ধর্মকেন্দ্রিক এটা যেমন সত্য, তেমনই সেই ধর্মাচরনের আবশ্যিক অঙ্গ ছিল কলাচর্চা আর সব কিছুর মূলে ছিল জীবনপ্রশ্ন। ধর্ম থেকে এখন বাদ গেছে শিল্পকলা, জীবনযাপন থেকে বাহুল্যবোধে বাদ গেছে নান্দনিকতা ও লাবণ্য। এই সময়ে দেশের মানুষের কাছে নন্দলাল বসুর এই দেওয়ালচিত্র কি দিতে পারে? নন্দলাল তো হিন্দু ধর্মের দেবদেবীর প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সেই শ্রদ্ধার স্বরূপ তবে কি? সেটা আসলে সুখে দুঃখে আনন্দে বেদনায় সুন্দরের অনুভব। মহাভারতে ন্যায়স্থাপনের জন্য অতবড় স্বজনঘাতী যুদ্ধের সব বীরদের ছবি আঁকলেন শিল্পী, তার পরেও আঁকলেন যা পড়ে থাকে তা ধর্মের জয়োল্লাস নয়, বরং চিতার লেলিহান শিখার সামনে গান্ধারীর হাহাকার। নটীর পূজায় আঁকলেন আত্মনিবেদনের এক চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে আঁকলেন ছাই হয়ে যাওয়া অহংকারশূন্য হৃদয় নিয়ে সুন্দরের শরীরে মিশে যাওয়া মীরাবাঈকে। আর রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনকে তীব্র বাঁকের মুখে এনে ফেলা এই সব প্রকান্ড উদ্দীপক  ঘটনার প্রেক্ষাপটে চালচিত্রের আদলে রাখলেন গঙ্গাবতরণ। সে ছবিতে মহাদেব জীবনপাত্রের বিষ ও মাধুর্য দুইহাতে নিয়ে সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করছেন। তাঁকে ঘিরে মন্ডনধর্মী অগ্নিশিখা। জীবনের যত গরল যত অমৃতকে আসলে ঘিরে থাকে অনুপম এক অলঙ্কৃত সৌন্দর্যবলয়, যা আছে বলে ইদানিং কালে আমরা আর বিশ্বাস করি না।

সহায়ক গ্রন্থ
1 .ভারতশিল্পী নন্দলাল- পঞ্চানন মন্ডল
2. দেশ পত্রিকার নন্দলাল বসু জন্মশতবর্ষ স্মারক সংখ্যা
3. তিন শিল্পী- শোভন সোম।

বরোদা স্টেশনের বাইরে থেকে  অটো করে খুব সামান্য দূরত্বে কীর্তি মন্দির। যাঁরা চিত্রকলায় উৎসাহী তাঁরা এখান থেকেই আরেকটি অটো করে যেতে পারেন ডান্ডিয়া বাজার, দেখতে পারেন    মহারাজের দেওয়ানের একদা বাসগৃহ তাম্বেকর ওয়াড়া।



























মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ